
বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ। দেশের প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত। প্রতি বছর লাখো দেশি-বিদেশি পর্যটক সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে এখানে ছুটে আসেন। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সেবার মান বাড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে। বরং সাম্প্রতিক সময়ে কক্সবাজারের সৈকত এলাকায় প্রকৃতির চেয়ে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডই বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন পর্যটক ও স্থানীয় সচেতন মহল।
কক্সবাজার সৈকতের লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে গেলে সমুদ্রের ঢেউয়ের পাশাপাশি চোখে পড়ে সারি সারি অস্থায়ী দোকান, ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতা, বিচ বাইক, ঘোড়া ও ফটোগ্রাফার। পর্যটকদের অনেকেই অভিযোগ করছেন, সৈকতে কিছুক্ষণ নিরিবিলি বসে সমুদ্র উপভোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। বারবার বিভিন্ন পণ্য কেনা, ছবি তোলা কিংবা অন্যান্য সেবার প্রস্তাব নিয়ে পর্যটকদের কাছে ছুটে আসছেন ব্যবসায়ীরা।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা লাভলী আক্তার বলেন, সৈকতে নামার কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিভিন্ন পণ্য বিক্রেতা ঘিরে ধরেন। কেউ কেউ ছবি তোলার প্রস্তাব দেন। সমুদ্র দেখতে এসে বারবার ব্যবসায়িক প্রস্তাব শুনতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক দম্পতি সোহেল মাজহার ও শিউলি আক্তারও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী সেবার মান বাড়েনি। বাসভাড়া, হোটেল, রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে সৈকতের বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে পর্যটকদের বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হয়।
শুধু সৈকত নয়, পর্যটন মৌসুমে শহরের সড়কগুলোতেও বাড়ছে ভোগান্তি। কলাতলী, সুগন্ধা ও ঝাউতলা এলাকায় দীর্ঘ যানজট এখন অনেকটা নিয়মিত ঘটনা। অপরিকল্পিত পার্কিং, ফুটপাত দখল ও অতিরিক্ত যানবাহনের কারণে পর্যটকদের দুর্ভোগ বাড়ছে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে নগর ব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশের ওপরও পড়ছে এর প্রভাব। কক্সবাজারের বন ও পরিবেশ সাংবাদিক পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা দীপু বলেন, কক্সবাজারের প্রধান সম্পদ সমুদ্র, বালুচর ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। কিন্তু অপরিকল্পিত বাণিজ্য, শব্দদূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড সৈকতের পরিবেশকে ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সৈকতের বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিক বোতল, খাবারের মোড়কসহ নানা ধরনের বর্জ্য পড়ে থাকতে দেখা যায়, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি তৈরি করতে পারে।
তবে ব্যবসায়ীদেরও রয়েছে ভিন্ন যুক্তি। কক্সবাজারের বিচ বাংলা ট্যুরিজমের ম্যানেজার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বলেন, পর্যটনকে ঘিরে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা গড়ে উঠেছে। হকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ফটোগ্রাফার, পরিবহন শ্রমিক, হোটেল-রেস্তোরাঁর কর্মচারীসহ বড় একটি অর্থনৈতিক চক্র কক্সবাজারকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। তাই ব্যবসা বন্ধ না করে সুশৃঙ্খল ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন।
পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বের জনপ্রিয় সমুদ্রসৈকতগুলোতে বাণিজ্যিক কার্যক্রমের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা থাকে। পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য রাখা হয় শান্ত পরিবেশ, পরিচ্ছন্ন সৈকত ও উন্নত নাগরিক সুবিধা। কক্সবাজারেও সৈকত ব্যবস্থাপনায় আধুনিক পরিকল্পনা, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট জোন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত পার্কিং এবং যানজট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।
কক্সবাজার কলাতলী-মেরিন ড্রাইভ রোড হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মৌখিম খান বলেন, শুধু পর্যটন মৌসুমে নয়, সারা বছর পর্যটক আকৃষ্ট করতে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। নিয়মিত মেলা ও বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি পর্যটকসেবার মান বাড়ানো হলে পর্যটকদের ভোগান্তিও কমবে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, কক্সবাজারের সৌন্দর্য শুধু পর্যটনের জন্য নয়, দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই উন্নয়ন ও বাণিজ্যের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সৈকতের উন্মুক্ততা, নান্দনিকতা ও স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে ভবিষ্যতে পর্যটকদের আগ্রহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, টেকসই পর্যটন উন্নয়নে পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বৃহৎ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে একটি মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কাজ চলছে। পাশাপাশি সৈকতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও পর্যটকদের নিরাপত্তা বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে কক্সবাজারে তিন দিনব্যাপী মেলাও শুরু হয়েছে। এবারের দিবসের মূল বার্তা টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও মানুষের জন্য উপযোগী পর্যটন গড়ে তোলা। কক্সবাজারের জন্যও এই বার্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই শহরের পরিচয় ও পর্যটন সম্ভাবনার মূল ভিত্তিই সমুদ্র।
অনিয়ন্ত্রিত বাণিজ্য, দখল ও অব্যবস্থাপনার চাপে যদি সমুদ্রের সৌন্দর্য ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে এর প্রভাব পড়বে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন শিল্পে। ব্যবসা থাকবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও চলবে; তবে সেই বাণিজ্য যেন কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে গ্রাস না করে—এটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। প্রকৃতি, পর্যটক ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজার আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে প্রত্যাশা—পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি সংরক্ষণ করা হবে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পরিবেশ। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও টেকসই উদ্যোগের মাধ্যমে বাড়বে পর্যটকের আগমন। আর বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে বাংলাদেশের এই সমুদ্রনগরী।